সূর্য সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা সকল প্রবন্ধ

তিথি, নক্ষত্র, করণ ও যোগ কীভাবে গণনা করা হয়

সূর্য ও চন্দ্রের নিরয়ণ দ্রাঘিমা থেকে তিথি, নক্ষত্র, করণ ও যোগ গণনার সূত্র, শেষ সময় অনুসন্ধান, তিথিক্ষয়-বৃদ্ধি এবং দণ্ড-পল-বিপল প্রদর্শনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা।

তিথি, নক্ষত্র, করণ ও যোগ কোনো নাগরিক তারিখের স্থির নাম নয়। সূর্য ও চন্দ্র আকাশে ক্রমাগত অবস্থান পরিবর্তন করছে; সেই পরিবর্তিত কৌণিক সম্পর্ককে নির্দিষ্ট ভাগে বিভক্ত করেই পঞ্চাঙ্গের এই অঙ্গগুলো নির্ণয় করা হয়। তাই একটি তিথি ঠিক ২৪ ঘণ্টা স্থায়ী হয় না এবং নক্ষত্রও প্রতিদিন একই ঘড়ির সময়ে পরিবর্তিত হয় না।

গণনার সাধারণ ভিত্তি

চারটি অঙ্গ বুঝতে প্রথমে দুটি মান প্রয়োজন:

  • সূর্যের নিরয়ণ দ্রাঘিমা—রাশিচক্রে সূর্যের অবস্থান, ০° থেকে ৩৬০°;
  • চন্দ্রের নিরয়ণ দ্রাঘিমা—রাশিচক্রে চন্দ্রের অবস্থান, ০° থেকে ৩৬০°।

“নিরয়ণ” বলতে নির্বাচিত অয়নাংশ বাদ দিয়ে নক্ষত্রভিত্তিক রাশিচক্রে প্রকাশিত অবস্থান বোঝানো হয়। সূর্যসিদ্ধান্তীয় ও আধুনিক দৃক্‌ ইঞ্জিন একই মুহূর্তের জন্য কিছুটা ভিন্ন দ্রাঘিমা দিতে পারে; কিন্তু একবার সূর্য ও চন্দ্রের দ্রাঘিমা পাওয়া গেলে নিচের বিভাগীয় সূত্রগুলো একই থাকে।

Normalize অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, চন্দ্রের দ্রাঘিমা ৫° এবং সূর্যের দ্রাঘিমা ৩৫৫° হলে সরাসরি বিয়োগে −৩৫০° পাওয়া যায়। কিন্তু প্রকৃত অগ্রবর্তী পার্থক্য ১০°। Normalize করার পরই সঠিক তিথি পাওয়া যাবে।

তিথি: সূর্য থেকে চন্দ্রের কৌণিক দূরত্ব

তিথি নির্ণয়ে সূর্য থেকে চন্দ্রের অগ্রবর্তী কৌণিক পার্থক্য নেওয়া হয়:

পূর্ণ ৩৬০° বৃত্তকে ৩০টি সমান ভাগে ভাগ করলে প্রতিটি তিথির কৌণিক পরিসর হয় ১২°। ফলে:

  • ০° থেকে ১২°—প্রথমা বা প্রতিপদ;
  • ১২° থেকে ২৪°—দ্বিতীয়া;
  • ১২০° থেকে ১৩২°—একাদশী;
  • ১৬৮° থেকে ১৮০°—পূর্ণিমা;
  • ৩৪৮° থেকে ৩৬০°—অমাবস্যা।

শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ

অমাবস্যার পর চন্দ্র সূর্য থেকে দূরে সরে ১৮০°-এর দিকে গেলে প্রথম ১৫ তিথি শুক্লপক্ষ। পূর্ণিমার পর ১৮০° থেকে আবার ৩৬০° বা পরবর্তী অমাবস্যার দিকে গেলে শেষ ১৫ তিথি কৃষ্ণপক্ষ।

কৌণিক পার্থক্য তিথি সংখ্যা পক্ষ
০° ≤ E < ১৮০° ১–১৫ শুক্লপক্ষ
১৮০° ≤ E < ৩৬০° ১৬–৩০; নাম আবার প্রথমা থেকে অমাবস্যা কৃষ্ণপক্ষ

নক্ষত্র: চন্দ্রের নিরয়ণ অবস্থান

নক্ষত্র নির্ণয়ে সূর্যের সঙ্গে চন্দ্রের পার্থক্য নয়, চন্দ্রের নিজস্ব নিরয়ণ দ্রাঘিমা ব্যবহার করা হয়। রাশিচক্রকে ২৭টি সমান ভাগে ভাগ করলে প্রতিটি নক্ষত্রের পরিসর:

০° মেষ থেকে অশ্বিনী শুরু হয় এবং ২৭তম রেবতীতে বৃত্ত শেষ হয়। নির্বাচিত অয়নাংশ পরিবর্তিত হলে চন্দ্রের নিরয়ণ দ্রাঘিমা বদলাতে পারে; ফলে সীমান্তের কাছে নক্ষত্র বা তার শেষ সময়েও পার্থক্য দেখা যেতে পারে।

নক্ষত্রের পদ

প্রতিটি নক্ষত্র আবার চারটি সমান পদে বিভক্ত। একটি পদের পরিসর ৩°২০′:

চন্দ্র একটি নক্ষত্রের শুরু থেকে যত দূর এগিয়েছে, সেটিকে ৩°২০′ ভাগ করে ১ থেকে ৪ পর্যন্ত পদ নির্ধারণ করা হয়। পদ পরিবর্তন নক্ষত্র পরিবর্তনের আগেও ঘটতে পারে; তাই রাশি চক্র বা দৈনিক পরিবর্তনের তালিকায় নক্ষত্র ও পদ পৃথক ঘটনা হিসেবে দেখা যায়।

করণ: একটি তিথির অর্ধাংশ

একটি তিথি ১২° কৌণিক পার্থক্যের সমান। তার অর্ধেক ৬° হলো একটি করণ। একটি চান্দ্র মাসে তাই মোট ৬০টি করণ-পর্ব থাকে:

কিন্তু ৬০টি পর্বের জন্য ৬০টি আলাদা নাম নেই। সাতটি চল করণ বারবার আবর্তিত হয় এবং চারটি স্থির করণ নির্দিষ্ট স্থানে থাকে।

চল করণের আবর্তন

বব → বালব → কৌলব → তৈতিল → গর → বণিজ → বিষ্টি—এই সাতটি করণ আটবার আবর্তিত হয়ে ৫৬টি পর্ব পূরণ করে।

চারটি স্থির করণ

চান্দ্রচক্রের শুরু ও শেষের নির্দিষ্ট চারটি পর্বে থাকে:

  1. প্রথম পর্ব—কিংস্তুঘ্ন;
  2. শেষের আগের তিন পর্ব—শকুনি, চতুষ্পদ ও নাগ।

ফলে করণ নির্ণয়ে শুধু ৬° ভাগ করলেই কাজ শেষ হয় না; প্রাপ্ত পর্ব সংখ্যাকে এই বিশেষ নামের ক্রমে map করতে হয়। বিষ্টি করণকে অনেক পঞ্জিকায় ভদ্রা নামেও উল্লেখ করা হয়।

যোগ: সূর্য ও চন্দ্রের সম্মিলিত দ্রাঘিমা

যোগ নির্ণয়ে সূর্য ও চন্দ্রের নিরয়ণ দ্রাঘিমা যোগ করে ৩৬০°-এর মধ্যে Normalize করা হয়। তারপর বৃত্তকে নক্ষত্রের মতো ২৭টি সমান ভাগে ভাগ করা হয়:

এই ২৭টি যোগ বিষ্কম্ভ থেকে বৈধৃতি পর্যন্ত ক্রমানুসারে চলে। নক্ষত্র শুধু চন্দ্রের অবস্থান অনুসরণ করে, কিন্তু যোগ সূর্য ও চন্দ্রের সম্মিলিত অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে—এটাই দুটির প্রধান গাণিতিক পার্থক্য।

একটি কল্পিত হিসাব

শুধু সূত্র বোঝানোর জন্য ধরা যাক, কোনো মুহূর্তে:

  • সূর্যের নিরয়ণ দ্রাঘিমা = ১৭৫°;
  • চন্দ্রের নিরয়ণ দ্রাঘিমা = ৩০৩°।
অঙ্গ হিসাব ফল
তিথি E = ৩০৩° − ১৭৫° = ১২৮°; floor(১২৮÷১২)+১ শুক্লপক্ষ একাদশী
নক্ষত্র floor(৩০৩÷১৩°২০′)+১ ২৩তম নক্ষত্র ধনিষ্ঠা; তৃতীয় পদ
করণ floor(১২৮÷৬)+১ = ২২তম পর্ব বিষ্টি
যোগ Normalize(১৭৫°+৩০৩°) = ১১৮° ৯ম যোগ শূল

“পর্যন্ত, পরে...” সময় কীভাবে পাওয়া যায়?

বর্তমান তিথি বা নক্ষত্রের নাম বের করা তুলনামূলক সহজ; কঠিন অংশ হলো এটি ঠিক কখন শেষ হবে। শুধু অবশিষ্ট ডিগ্রিকে কোনো গড় গতিতে ভাগ করলে নির্ভুল ফল পাওয়া যায় না, কারণ সূর্য ও বিশেষত চন্দ্রের আপাত গতি সমান থাকে না।

সফটওয়্যার সাধারণত সীমা-অনুসন্ধান বা root-finding পদ্ধতি ব্যবহার করে:

  1. বর্তমান অঙ্গের পরবর্তী কৌণিক সীমা নির্ধারণ করা হয়—যেমন তিথির জন্য পরবর্তী ১২° গুণিতক;
  2. সময়ের একটি নিরাপদ পরিসরে সীমাটি অতিক্রম হয়েছে কি না পরীক্ষা করা হয়;
  3. দুই প্রান্তের মধ্যে সময়কে বারবার ছোট করে সীমা অতিক্রমের মুহূর্ত অনুসন্ধান করা হয়;
  4. প্রয়োজনীয় সেকেন্ড বা তারও সূক্ষ্ম নির্ভুলতায় পৌঁছালে অনুসন্ধান শেষ হয়;
  5. প্রাপ্ত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সময় নির্বাচিত স্থানের timezone-এ রূপান্তর করা হয়।

৩৬০° থেকে ০°-এ ফিরে আসার সময় angle wrap বিশেষভাবে সামলাতে হয়। তা না হলে অমাবস্যা, রেবতী থেকে অশ্বিনী অথবা বৈধৃতি থেকে বিষ্কম্ভের সীমায় অনুসন্ধান ভুল দিকে যেতে পারে।

সূর্যোদয়ে তিথিক্ষয় ও তিথিবৃদ্ধি

তিথির অস্তিত্ব এবং পঞ্জিকায় তার প্রয়োগ এক বিষয় নয়। দৈনিক পঞ্জিকায় পরপর সূর্যোদয়ে কোন তিথি আছে, সেটিও পরীক্ষা করা হয়।

  • তিথিবৃদ্ধি: একই তিথি পরপর দুই সূর্যোদয়ে উপস্থিত থাকলে সেটি দুই পঞ্জিকা-দিনে দেখা যায়;
  • তিথিক্ষয়: একটি তিথি এক সূর্যোদয়ের পরে শুরু হয়ে পরবর্তী সূর্যোদয়ের আগেই শেষ হলে কোনো সূর্যোদয়ে তার উপস্থিতি থাকে না;
  • অহোরাত্র: বর্তমান sunrise-to-next-sunrise window-এর মধ্যে তিথির শেষ না হলে দৈনিক প্রদর্শনে অহোরাত্র লেখা হতে পারে।

ক্ষয় হওয়া মানে তিথিটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিকভাবে ঘটেনি—এমন নয়। তিথিটি ঘটেছে, কিন্তু কোনো স্থানীয় সূর্যোদয়ের সময় বর্তমান ছিল না। উৎসব নির্ধারণে তখন সংশ্লিষ্ট তিথির মধ্যাহ্ন, প্রদোষ বা নিশীথব্যাপ্তির মতো বিশেষ বিধি প্রয়োজন হতে পারে।

ঘড়ির সময়ের সঙ্গে দণ্ড, পল ও বিপল

প্রচলিত পঞ্জিকায় ঘটনার সময় সূর্যোদয় থেকে অতিবাহিত ঐতিহ্যগত এককে দেখানো হয়। সমান ২৪ ঘণ্টার দিনকে ৬০ দণ্ড বা ঘটিকায় ভাগ করলে:

আমাদের দৈনিক বিবরণে ব্যবহারকারীর সুবিধার জন্য স্থানীয় AM/PM ঘড়ির সময় এবং সূর্যোদয় থেকে গণিত দণ্ড–পল–বিপল—দুটিই দেখানো যেতে পারে। দণ্ডের মান গণনা করতে অবশ্যই সেই স্থানের সেদিনের সূর্যোদয় ব্যবহার করতে হবে; একটি স্থির সকাল ৬টা ধরে নেওয়া উচিত নয়।

সূর্যসিদ্ধান্ত ও দৃক্‌ পদ্ধতিতে পার্থক্য কোথায়?

তিথির ১২°, করণের ৬°, নক্ষত্র ও যোগের ১৩°২০′—এই গাণিতিক বিভাগ দুই পদ্ধতিতে বদলে যায় না। পার্থক্য তৈরি হয় সূর্য ও চন্দ্রের দ্রাঘিমা কীভাবে পাওয়া হচ্ছে সেখানে।

স্তর সূর্যসিদ্ধান্তীয় পদ্ধতি আধুনিক দৃক্‌ পদ্ধতি
গ্রহের ভিত্তি ঐতিহ্যগত যুগ, গড় গতি, মন্দ-শীঘ্র সংশোধন ও বীজ আধুনিক ephemeris ও পর্যবেক্ষণভিত্তিক গাণিতিক মডেল
নিরয়ণ রূপান্তর প্রকল্পে ঘোষিত ঐতিহ্যগত অয়ন ও ধ্রুবক নির্বাচিত আধুনিক অয়নাংশ, যেমন লাহিড়ী
বিভাগীয় সূত্র ১২°, ৬° ও ১৩°২০′ সীমা একই বিভাগীয় সীমা
সম্ভাব্য পার্থক্য সীমান্তের কাছে নাম, পদ অথবা শেষ সময়ে পার্থক্য দেখা যেতে পারে

এই কারণে ফল প্রকাশের সময় গণনা-পদ্ধতির নাম দেখানো জরুরি। শুধু “তিথি শেষ রাত ১০:১৫” লিখলে তুলনা অসম্পূর্ণ; কোন engine, অয়নাংশ, স্থান ও timezone ব্যবহার করা হয়েছে সেটিও জানা দরকার।

উপসংহার

তিথি, নক্ষত্র, করণ ও যোগের নামের পেছনে চারটি পরিষ্কার কৌণিক বিভাগ রয়েছে। তিথি সূর্য থেকে চন্দ্রের ১২° ব্যবধান, করণ তার ৬° অর্ধাংশ, নক্ষত্র চন্দ্রের ১৩°২০′ নিরয়ণ বিভাগ এবং যোগ সূর্য–চন্দ্রের সম্মিলিত দ্রাঘিমার ১৩°২০′ বিভাগ।

তবে একটি পূর্ণাঙ্গ পঞ্জিকা তৈরি করতে নাম নির্ণয়ই যথেষ্ট নয়। সীমা অতিক্রমের সঠিক মুহূর্ত অনুসন্ধান, স্থানীয় সময়ে রূপান্তর, সূর্যোদয়ে উপস্থিতি, ক্ষয়-বৃদ্ধি এবং উৎসবের বিশেষ কালবিচারও যুক্ত করতে হয়। এই স্তরগুলো আলাদা করে প্রকাশ করলে ব্যবহারকারী ফল দেখতে এবং গবেষক গণনা যাচাই করতে—দুজনেই সুবিধা পান।

তথ্যসূত্র ও আরও পাঠ

  1. Ebenezer Burgess, Translation of the Sûrya-Siddhânta: A Text-book of Hindu Astronomy, 1860.
  2. Swiss Ephemeris documentation, Astrodienst AG—আধুনিক সূর্য ও চন্দ্রের অবস্থান এবং সময়-অনুসন্ধানের সহায়ক নথি।
  3. প্রচলিত বাংলা পঞ্জিকার তিথি, নক্ষত্র, করণ, যোগ এবং দণ্ড–পল–বিপল প্রদর্শনরীতি।
  4. সূর্য সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা প্রকল্পের classical result, daily transition এবং sunrise-based reporting engine.

মন্তব্য, আলোচনা ও প্রশ্ন